নিরাকার ঈশ্বর ও অবতারবাদ।

নিরাকার_ঈশ্বর_ও_অবতারবাদ ঈশ্বর নিরাকার না কি সাকার এই নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক।ঈশ্বরকে সাকার রূপে বিবেচনা করে পুরাণে বর্ণিত হয়েছে অনেক গল্পের। দেখা যাক সনাতন ধর্মের প্রধান পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বেদ ঈশ্বরের স্বরূপ নিয়ে কি বলে- ♦️স পর্যাগচ্ছুক্রমকায়ম ব্রণম স্নাবিরং শুদ্ধ মপাপ বিদ্ধম্ কবিৰ্মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভুর্যাথা তথ্যতােহর্থাম্ব্যদধাচ্ছা শাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ।। (যজুৰ্বেদ ৪০/৮) ভাবার্থঃ- পরমাত্মা সর্বব্যাপক, সর্বশক্তিমান, শরীররহিত, রােগরহিত,জন্মরহিত, শুদ্ধ, নিম্পাপ, সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী, দুষ্টের দমন কর্তা ও অনাদি । তিনি তাঁহার শাশ্বত প্রজা জীবের জন্য যথাযথ ফলের বিধান করেন। ♦️ন দ্বিতীয়ো ন তৃতীয় শ্চতুর্থো নাপ্যুচ্যতে। ন পঞ্চমাে ন যষ্ঠঃ সপ্তমাে নাপ্যুচ্যতে।নাষ্টমো ন নবমে দশমো নাপ্যুচ্যতে। য এতং দেবমেক বৃতং বেদ।। অথৰ্ববেদ( ১৩/৪/২)(১৬/১৭/১৮)। ভাবার্থঃ- পরমাত্মা এক, তিনি ছাড়া কেহই দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ,সপ্তম, অষ্টম, নবম বা দশম ঈশ্বর বলিয়া অভিহিত হয় না। যিনি তাঁহাকে শুধু এক বলিয়া জানেন তিনিই তাহাকে প্রাপ্ত হন। এক ঈশ্বর চিন্তন জ্ঞানীর, বহু ঈশ্বরের ধারণা মুর্খের। ♦️ঈশা বাস্য মিদং সৰ্ব্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য সিদ্ধনম্ । (যজুৰ্বেদ ৪০/১) ভাবার্থঃ- প্রকৃতি হইতে পৃথিবী পর্যন্ত সব পরিবর্তনশীল সৃষ্টিতে চরপ্রাণী মাত্রই পরমাত্মা দ্বারা আচ্ছাদিত। সেই পরিত্যজ্য জগতে ভােগের অনুভব কর, কাহারও কোনও পদার্থে লােভ করিও না। বেদে স্পষ্টতই বলা হয়েছে এক এবং অদ্বিতীয়,জন্মরহিত শরীররহিত অর্থাৎ নিরাকার । বেদ অনুসারে ঈশ্বর সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ঈশ্বর সাকার হলে সর্বব্যাপক হতে পারে না কারণ তিনি দেহ দ্বারা সীমাবদ্ধ এবং নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির।ঈশ্বর সাকার হলে তাঁর মধ্যে অনাদি ও অনন্ত গুনের অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ জাগতিক দেহধারী সকল কিছুরই অন্ত আছে বিনাশ আছে এবং আদিতে তার কোন অস্তিত্ব থাকে না। 💎💎করণবচ্চেন্ন ভােগাদিভ্যঃ।। (বেদান্তদর্শন-২/২/৪০) জীববৎ করণকলেবরকল্পনাপি ন সম্ভবতি ভােগাদি-প্রসক্তে। ব্যাখ্যাঃ-জীব অর্থাৎ আত্মা অদৃষ্ট হয়েও যেমন ইন্দ্রিয় দ্বারা দেহের সাথে যুক্ত হয় তদ্রূপ ঈশ্বর ইন্দ্রিয়ের সাথে যুক্ত হলে জীবের ন্যায় ঈশ্বরেরও সুখ,দুঃখ,ভোগ প্রসঙ্গ হবে।সেক্ষেত্রে ঈশ্বরত্বের কিছুই থাকবে না। 💎💎পরমাত্মা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আধার।এই জগত তিনি ধারণ করে আছেন।এখন তিনি যদি সাকার হয়ে থাকেন তবে তিনি এই জগতের আশ্রয়ে আছেন। তাঁর আশ্রয়স্থল যদি সপ্তআকাশ, চতুর্থ আকাশ বা বৈকুণ্ঠ হয় অর্থাৎ তিনি যদি নিজেই জগতের আশ্রয়ে থাকেন তবে এই জগত কার আশ্রয়ে আছে? ♦️সেই পরমাত্মা জ্যোতিসমূহেরও জ্যোতি। তিনি সকল অন্ধকার অতীত। তিনি জ্ঞান,জ্ঞানের বিষয়, জ্ঞানের লক্ষ্য। তিনি সকলের হৃদয়ে স্থিত আছেন। (শ্রীমদ্ভগবদগীতা ১৩/১৭) 💎💎পরমাত্মা সচ্চিদানন্দ। এই সচিদানন্দ শব্দের তিনটি অংশ আছে। সৎ,চিৎ ও আনন্দ।সৎ অর্থাৎ ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্তমান এই তিন কালেই যিনি অপরিবর্তিত থাকে।চিৎ অর্থাৎ যিনি জ্ঞানযুক্ত আর যার মধ্যে দুঃখের অস্তিত্ব নেই তিনিই আনন্দ। জগতে যত সাকার পদার্থ দেখা যায় সবকিছুই পরিবর্তিত হয়।জ্ঞান কেবলমাত্র চেতনা শক্তিসম্পন্ন নিরাকার আত্মা ও পরমাত্মার উভয়ের মধ্যে পাওয়া যায়।ঈশ্বর শাখার হলে তিনি এই দুটি গুণরহিত হয়ে যাবেন। 💎💎জগতের সকল সাকার পদার্থ কোন না কোন উপাদান দিয়ে তৈরি।ঈশ্বর যদি সাকার হন তবে তিনি কোনো না কোনো পদার্থ দ্বারা তৈরি। তবে সেই পদার্থ কে সৃষ্টি করেছে? আর যদি ঈশ্বর করে থাকেন তবে তা তৈরীর আগে তিনি নিরাকার ছিলেন। 💎💎ঈশ্বর সাকার হলে তিনি সর্বজ্ঞত্ব গুণরহিত হবেন।কারণ সাকার হলে তিনি একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করবেন অর্থাৎ সর্বত্র তাঁর পক্ষে থাকা সম্ভব হবে না। যদি সর্বত্র না থাকেন তাঁর পক্ষে সব স্থানের জ্ঞান থাকা সম্ভব হবে না। তার জ্ঞান একস্থানেরই হবে। 💎💎উপরোক্ত সকল বিষয়ের উত্তর যদি এটা হয় যে ঈশ্বর যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন।তাহলে এই সৃষ্টি নির্দিষ্ট নিয়মে চলত না।সৃষ্টি হতো বিশৃঙ্খলার। মহাবিশ্বের অস্তিত্ব সংকটে পড়ত।যার থেকেই নিয়মের সৃষ্টি নিশ্চয়ই তিনি নিয়মবহির্ভূত কোন কাজ করবেন না। আপনি যেমন নিজেকে শক্তিমান প্রমাণ করার জন্য অকারণে মারামারি করবেন না।তেমনি সর্বশ্রেষ্ঠ বলে ঈশ্বর সৃষ্টির নিয়মবহির্ভূত যাই ইচ্ছা তাই করবেন না।যদি তাই হয় তবে তাঁকে আর সর্বশ্রেষ্ঠ বলা যাবে না। চলমান...

0 Comments